ঢাকা ২১ জুন, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
মমতার তৃণমূলের পর এবার ভাঙনের মুখে উদ্ধবের শিবসেনা মির্জা আব্বাস আগের তুলনায় অনেকটা সুস্থ: রেল প্রতিমন্ত্রী ভেঙে গেলো ১৪ লাখ টাকার বাঁশের পাইলিং, হুমকিতে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু হামের টিকা দেওয়ায় গাফিলতি তদন্তের দরকার নেই: জিয়াউদ্দিন হায়দার বিকল্প ইঞ্জিনে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর ফেনী ছাড়ল মেঘনা এক্সপ্রেস লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে গেলো ইসরায়েল-হিজবুল্লা ৬ দিনের সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, রওনা হবেন রোববার দেশে ফিরেছেন ৬১ হাজার ৬৯৭ হাজি মাছ-মুরগি আগের দামে, সবজিতে কিছুটা স্বস্তি ইরানের বন্দর-উপকূল থেকে অবরোধ তুলে নিলো যুক্তরাষ্ট্র

খোকার সাবেক এপিএস মান্নার পুনরুত্থান, প্রশাসনিক অঙ্গনে বাড়ছে আলোচনা

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জানুয়ারি, ২০২৬,  11:39 AM

news image

দীর্ঘ এক যুগ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাবেক এপিএস সিদ্দিকুর রহমান মান্না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনের বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, দেশে ফেরার পর তিনি একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সচিবালয়কেন্দ্রিক তদবির, প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের তৎপরতায় সক্রিয় হয়েছেন। তার এই পুনরুত্থানকে ঘিরে প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুবাদে বরিশাল বিভাগের দ্বীপ জেলা ভোলার বাসিন্দা 'মান্না' একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন তিনি। এমনকি খোকা পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপরও ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান মান্না। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে গ্রীন কার্ড লাভের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ঠিকাদারি ও নির্মাণ খাতের কয়েকজন আওয়ামী ঘনিষ্ঠ‌ ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসেই মান্না তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিকে শামীমের ব্যবসায়িক পার্টনার দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরী ওরফে স্বপন চৌধুরীর কোম্পানিতে অবৈধভাবে উপার্জন করা অর্থ বিনিয়োগ করেন। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ পান। 

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আবারও সক্রিয় হন মান্না। দেশে ফিরেই তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঠিকাদার স্বপন চৌধুরীসহ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন । সচিবালয়কেন্দ্রিক তদবির বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে নিজেকে জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা ব্যবসায়ী, ঠিকাদার এমনকি আওয়ামীলীগের একাধিক নেতার কাছ থেকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করছেন। ফলে দেশে ফেরার পর থেকেই মান্নার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড নিয়ে দলীয় ও প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

একাধিক সূত্রের দাবি, উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি, ব্যক্তিগত পরিচয় এবং রাজনৈতিক যোগাযোগকে পুঁজি করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করেন তারা।  এর মাধ্যমে তদবির, পদায়ন, নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলের একাধিক সূত্র বলছে, মান্নাকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ইতোমধ্যে দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশে ফিরে তিনি প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করলেও অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকেই তার প্রতি আস্থা রাখতে অনাগ্রহী।

আওয়ামীলীগ সরকারের সময় থেকেই মান্নার বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের সাথে মিলে মিশে প্রভাব খাটিয়ে তদবির বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সে সময় তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাধ্যমে ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার দখলকৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নিয়মিত সম্পৃক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ ও পদায়নকে কেন্দ্র করে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মান্নার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের এসব কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে দলীয় বিভিন্ন মহলে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদেশে অবস্থান করেও বন্ধুদের মাধ্যমে প্রভাব ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা মান্না, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফিরে আবারও তদবির, প্রভাব বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। দেশে ফেরার পর তিনি ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তার অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অভিযোগের কারণে খোকা পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি।

‘মান্না সিন্ডিকেট’ ভবিষ্যতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলে একদিকে যেমন দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও প্রভাব বাণিজ্যের কারণে অজান্তেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। রাজনৈতিক পরিচয় ও নেতাদের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত যেকোনো অপতৎপরতা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট নেতাদেরও বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য হুমকি নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি দলের নাম ও শীর্ষ নেতাদের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি দলের ভাবমূর্তির ওপর পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তদবির বাণিজ্য ও প্রভাবভিত্তিক সিন্ডিকেটের বিস্তার ঘটলে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্ব পায়। এতে প্রশাসনে অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়।

logo
সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ শাহ মোঃ রেজাউল করিম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মো. বেলাল শেখ