ঢাকা ২১ মে, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের ৯০তম বৈঠক আজ ড. আবুল বারকাতের জামিন বহাল ঝিনাইদহে মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, ৫ ঘণ্টা পর চলাচল শুরু প্রাণঘাতী ইবোলার টিকা আসতে সময় লাগতে পারে ৯ মাস : ডব্লিউএইচও গুলির পর স্পিডবোটে তুলে নেওয়া স্বপন জীবিত না মৃত, জানে না পরিবার ট্রেনে ফিরতি যাত্রা : আজ বিক্রি হবে ৩১ মে’র টিকিট বাড়ল সোনার দাম বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে কারা, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কোথায় ভূমি সেবা পেতে আর দুর্নীতির শিকার হতে হবে না : প্রধানমন্ত্রী সোনারহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলির জবাবে বিজিবির পাল্টা ফায়ার

গুলির পর স্পিডবোটে তুলে নেওয়া স্বপন জীবিত না মৃত, জানে না পরিবার

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ মে, ২০২৬,  12:11 PM

news image

রাজশাহীর পদ্মার চরে গুলি করে স্বপন বেপারীকে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায় একদল অস্ত্রধারী। বুধবার (২০ মে) রাত ৮টায় পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বপন নিখোঁজের ৪০ ঘণ্টা পার হলেও তার সন্ধান মেলেনি।

এদিকে গুলিবিদ্ধ স্বপন মৃত নাকি জীবিত আছেন সেটি নিয়েও দ্বিধায় রয়েছে পুলিশ। লাশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে পুলিশ মৃত বলে ঘোষণা করেনি। তবে স্বপনের পরিবারের দাবি, স্বপন আর বেঁচে নেই। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়।

পুলিশ বলছে, পদ্মার চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার, মাদক এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আগাচ্ছি। নিখোঁজ স্বপনকে উদ্ধারে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

এর আগে মঙ্গলবার (১৯ মে) গভীর রাত ১২টার দিকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালিতে একদল অস্ত্রধারী গুলি করে স্বপন বেপারীকে। এ সময় তাদের গুলি হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন জিয়াউল হক। তিনি স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিলেও ঘটনার সময় থেকে স্বপন নিখোঁজ রয়েছে। 

স্থানীয় একটি সূত্র বলছে, পদ্মার চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, জবরদখল, বালু মহলের ভাগবাটোয়ারা, মাদকসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যেই চরের পরিবেশ অস্থির হয়ে ওঠে। এসব কর্মকাণ্ডে ১১টি বাহিনীর নাম বিভিন্ন সময় উঠে আসে। গেল বছরের ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরে গোলাগুলিতে বাঘার নাজমুল ও আমান এবং কুষ্টিয়ার লিটনের মৃত্যু হয়। এরপরে মূলত পদ্মার চরের ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ব্যাপক আলোচনায় আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোপূর্বে নানা অভিযান পরিচালনা করলেও চরাঞ্চলে গোলাগুলি এবং হত্যার মতো অপরাধ থামানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এই এলাকাগুলোতে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা গেছে, নিখোঁজ স্বপনের একটি মুদি দোকান রয়েছে। তার বাড়ির পাশে নদীতে বালু তোলার ৩৩টি ড্রেজার। সেখান থেকে লোকেরা তেল কিনতেন। স্বপনের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে আর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

স্বপনের মা রোকেয়া বেগম বলেন, ঘটনার দিন সোমবার আমার ছেলে গরমের কারণে বাড়ির সামনে বসে ছিল। কিছুক্ষণ পরই দুটি নৌকা এসে ঘাটে ভেড়ে। নৌকায় থাকা ব্যক্তিরা স্বপনকে জিজ্ঞাসা করে ‘তুই এখানে কেন?’ তখন স্বপন বলে ‘এটা আমার বাড়ি। আমার বাপের বাড়ি।’ এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা গুলি চালায়।

স্বপনের মা রোকেয়া বেগম আরও বলেন, এ কথা শুনে আমি ঘরের জানালা খুশি। জানালার পাশে কয়েকজন দাঁড়িয়েছিল। তারা হুমকি দিয়ে বলে, ‘জানালা বন্ধ কর, না হলে তোরেও গুলি করব।’

এ ঘটনায় পর দিন বুধবার (২০ মে) স্বপন বেপারীর বাবা সিদ্দিক বেপারী বাঘা থানায় অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, বাঘা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল হক। বুধবার (২১ মে) রাত ৮টা পর্যন্ত পুলিশ স্বপনকে উদ্ধার করতে পারেনি। এই ঘটনায় কাউকে আটকও করতে পারেনি।

স্বপনের বাবা সিদ্দিক বেপারী বলেন, রাত ১২টার দিকে দুইটা ট্রলারে ১৫ থেকে ১৬ জন আসেন। এ সময় তারা এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে। তারা আমার ছেলে স্বপনকে গুলি করে ধরে নিয়ে যায়। ঘটনার পর রাতে পুলিশ এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন। থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। এখনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। 

যেহেতু পদ্মার চরে আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও ডাকাতির ঘটনাগুলোতে বিভিন্ন বাহিনীর নাম সামনে আসে। আর স্বপনকে গুলি করে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে কাকন বাহিনীর এক ব্যক্তির সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। নাম ও অডিও (কল রেকর্ড) প্রকাশ না করার শর্তে কাঁকন বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া ৫০ ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তি মুঠোফোনে  সঙ্গে কথা বলেছেন।

দাবি করে বলেন, বালুঘাটের মালিকানা বা পার্টনার হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার কাকন সাহেব লালপুরের তিলকপুরের ঘাটে ছিলেন গত বছর। এই বছর ঘাটটি সরকারিভাবে ডাক হয়নি। তিনি এবং তার সঙ্গে যারা ব্যবসায়িক অংশীদার রয়েছেন তারা কেউই নদীতে থাকেন না। বাঘায় যে ঘটনা সেখানে আরফান নামের এক লোক সে ঘাটটা নিয়েছেন চলতি পহেলা বৈশাখ থেকে। ঘাটের দখল নেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি বাহিনী একাধিকবার মাঝিমাললাদের ওপর হামলা করে এবং গোলাগুলি করে। 

তিনি বলেন, ঘাটটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য। প্রতিদিন যা কালেকশন হবে তার ফিফটি-ফিফটি ভাগ নেনে বাহিনীটি। যারা বৈধ ব্যবসা করে তারা একটা সন্ত্রাসী বাহিনীকে আয়ের অর্ধেক দিয়ে দিবে এটা তো কারও পক্ষে সম্ভব না।

তবে কাকন বাহিনীর এক সদস্যের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে ওই বাহিনীর সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাই এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, স্বপন সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছে। নিখোঁজ স্বপন জীবিত নাকি মৃত বলা যাচ্ছে না। আমরা আধিপত্য বিস্তার, মাদক এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আগাচ্ছি।

মাঝেমধ্যে রক্তাক্ত হয় পদ্মার সাদা বালি ও কাশফুল। এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনাগুলোতে বেশিরভাগই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরে জমি ও কাশ (খর) কাটাকে কেন্দ্র করে মন্ডল ও কাকন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মন্ডল বাহিনীর বাঘার বাসিন্দা নাজমুল মন্ডল ও আমান মন্ডলের মৃত্যু হয়। এছাড়া কুষ্টিয়ার লিটন নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এরপর পদ্মার চরের ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় প্রশাসনের ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’ অভিযানে কয়েক দফায় ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

এ নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার পদ্মার চরে কাঁকন বাহিনীসহ ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। রোকনুজ্জামান কাঁকন, যিনি ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন নামে পরিচিত, তার বাহিনীর নৃশংসতায় চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে রয়েছে। অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে-মণ্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, সুখচাঁদ বাহিনী ও নাহারুল বাহিনী।

সবশেষ ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১টার দিকে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরে নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সোহেল রানা। এ সময় তার স্ত্রী সাধিনা বেগমের ডান হাতের আঙুলে গুলি লাগে এবং তিনিও আহত হন। সোহেল রানা পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরের কালু মণ্ডলের ছেলে। আহত সাধিনা বেগমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

logo
সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ শাহ মোঃ রেজাউল করিম
নির্বাহী সম্পাদকঃ মো. বেলাল শেখ