স্পোর্টস ডেস্ক
০৪ মার্চ, ২০২৬, 1:28 PM
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ট্রাম্পের ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব ও বিশ্বকাপ ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে শুধু আলোর ঝলকানি, আর ভূমিতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশ্বজুড়ে ত্রাহি ত্রাহি ডাক। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। ক্রীড়াঙ্গনেও পড়েছে এর কোপ। বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে মধ্যপ্রাচ্যের নানান দেশে থাকা খেলোয়াড়রা আটকে পড়েছেন, বন্ধ হয়ে গেছে খেলা। অথচ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর ১০০ দিনও নেই। প্রশ্ন উঠছে, এই যুদ্ধের বয়স পাঁচ দিন, এভাবে আরও কিছু দিন বা কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকলে বিশ্বকাপ হবে তো?
এই তীব্র যুদ্ধে জড়িত দুটি দেশ আষ্টেপৃষ্টে ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আগ্রাসন চালানো যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসরের প্রধান আয়োজক। আর তাদের নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ ইরান টানা চতুর্থবার বিশ্বকাপ খেলতে নামছে, কিন্তু সবগুলো ম্যাচই আমেরিকায়। নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সঙ্গে তাদের গ্রুপ ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলসে, সিয়াটলে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর।
বিশ্বকাপে কি অংশ নেবে ইরান? অনুমান করে বলে দেওয়া যায়— না! ইরানিয়ান টেলিভিশনকে ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মেহদি তাজ কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না, ‘যা হয়েছে... এবং যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে, মনে হয় না আমরা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছি। কিন্তু ক্রীড়া প্রধানরাই এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া না নেওয়ার বিষয়ে কে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাও ভাবনার বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে ইরানের অংশগ্রহণ অসম্ভব।
ফিফা বলেছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু এই পর্যায়ে কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন, তারা ইরানের বিশ্বকাপে খেলার প্রত্যাশা করছেন। গত শনিবার ফিফার মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম বলেছেন, সবার অংশগ্রহণে নিরাপদ বিশ্বকাপ আয়োজনেই তাদের মনোযোগ।
কিন্তু এনিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব তার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ‘(যদি ইরান বিশ্বকাপে অংশ নেয়) আমি মোটেও পরোয়া করি না। আমার মতে ইরান খুব বাজেভাবে পরাজিত দেশ। তারা ধোঁয়ায় উড়ছে।’ পরবর্তীতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ হোয়াইট হাউজের একজন মুখপাত্রের কাছে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চায়। যার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের পরিচালক অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানি মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্বের মানুষদের রক্ষা, বিশেষ করে আমেরিকান এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে আসার পরিকল্পনা করা মিলিয়ন মানুষের নিরাপত্তার জন্য যেকোনো অস্থিতিশীল হুমকি দূর করতে হবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর ইরানসহ ১২টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করার প্রচেষ্টা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। যদিও বিশ্বকাপের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফরা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত, তবুও ইরান তাদের কিছু কর্মকর্তার ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ড্র বয়কট করার হুমকি দিয়েছিল।
ইরান যদি খেলায় অংশ নেয়, তবে দলের ম্যাচগুলো এবং অ্যারিজোনায় তাদের পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে দেশটির ম্যাচ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। সেই ম্যাচ ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ওয়েলসের বিরুদ্ধে তাদের দ্বিতীয় ম্যাচের সময় ইরান সরকারকে নিয়ে ভিন্নমত পোষণকারী সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছিল। এবং ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্পের আশার পরিপ্রেক্ষিতে এই গ্রীষ্মেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হওয়া সম্ভব। ইরানের দুটি ম্যাচের ভেন্যু লস অ্যাঞ্জেল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইরানি জনগোষ্ঠীর বসবাস।
মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কয়ার-এর নিক ম্যাকগিহান বলেন, ‘আমরা এক অজানা পরিস্থিতিতে রয়েছি, কারণ বিশ্বকাপের শুরু হতে তিন মাসেরও কম সময় বাকি আর আয়োজকরা এইমাত্র একটি অংশগ্রহণকারী দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে। যদি ইরান তাদের দল প্রত্যাহার করে নেয়, যেটা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত পরিণতি বলে মনে হচ্ছে, তবে প্রতিবাদ ও অস্থিরতার আশঙ্কা কমে যাওয়ায় ফিফা সম্ভবত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।’
কিন্তু ইরান না থাকলেও উত্তেজনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যেহেতু এই ইভেন্টটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের মুহূর্তে হচ্ছে এবং গত বছরের ক্লাব বিশ্ব কাপ ও রাইডার কাপের মতো এখানেও ট্রাম্পের দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকবে।
মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকদিন আগে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ১১টি আয়োজক শহর আংশিক সরকারি শাটডাউনের কারণে আটকে থাকা তহবিল না পেলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘বিপর্যয়কর’ পরিণতি হতে পারে। তাছাড়া প্রস্তুতিও সময়সূচির চেয়ে পিছিয়ে আছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া টুর্নামেন্টে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্সির কর্মকর্তাদের ব্যবহার এবং প্রতিবেশী ও সহ-আয়োজক মেক্সিকোতে কার্টেল সহিংসতার প্রাদুর্ভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহ-আয়োজক কানাডার সম্পর্কও ট্রাম্পের আরোপিত ধারাবাহিক বাণিজ্যিক শুল্কের কারণে পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
নতুন করে যুক্ত হলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাংদেহী সংঘাত। যেটা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না ডক্টর সানাম ওয়াকিল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউস-এর মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের এই পরিচালক বলেন, ‘তেহরানের জন্য এটি ১২ দিনের কোনো সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ নয় বা উত্তেজনার এমন কোনো সীমিত পর্যায় নয় যা থামানো ও পুনরায় শুরু করা সম্ভব। সংঘাতের এই নতুন ধাপটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও স্পষ্টতই এটি শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার বিষয়। এটি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও কম।’
প্রশ্ন উঠতে পারে, আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে তো হামলার ঘটনা ঘটছে না। তাহলে বিশ্বকাপ হতে বাধা কোথায়? কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তার বিরাট প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে। যে কোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে পূর্বপরিকল্পনা। তার কোপ পড়তে পারে বিশ্বকাপের ওপরও! তাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের পর প্রথমবার স্থগিত হতে পারে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।